বাঘের ঘরে হাতির বাসা

[বাবার লেখা সত্যি ঘটনা ]

সে বছর ফিল্ড ছিল ভূটানের পাদদেশে উত্তরবঙ্গের জয়ন্তী এলাকায়। জয়ন্তী নামটি ভ্রমণপিপাসু বাঙালীর কাছে অতি পরিচিত। এলাকাটি বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্পের অন্তর্গত। কাজ করতে গিয়ে তেনার দেখা না পেলেও সক্কাল সক্কাল চরণচিহ্ন দেখেছি পাহাড়ী ঝোরার ভিজে বালিতে। ভোরবেলায় সামান্য বৃষ্টি থামবার পর কাজ শুরু করেছিলাম। জিপ ছেড়ে দিয়ে পাহাড়ী ঝোরার খাত বরাবর পাহাড়ের উপর দিকে উঠছি। হঠাৎ ফিল্ড কুলি ছেলেটি পিছন থেকে জামা টেনে ধরলো। ওর দিকে ফিরে তাকাতে আমার পায়ের কাছেই বালির উপর দেখতে ইশারা করলো। স্পষ্ট থাবার ছাপ। ভোরের বৃষ্টিফোঁটার ছাপের উপর থাবার ছাপ। অর্থাৎ টাটকা। ছেলেটি মন দিয়ে দেখে মন্তব্য করলো বাঘ উপর থেকে নীচের দিকে গিয়েছে। আমরা বাঘ এড়াতে দ্রুত নীচ থেকে উপরের দিকে উঠে এলাম।

তা আমার কাহিনী কিন্তু বাঘের নয় — হাতির। রাজাভাতখাওয়া ছেড়ে উত্তরদিকে জয়ন্তী পৌছতে যেতে হবে দমনপুর জঙ্গল এলাকার বুক চিরে। এ জঙ্গল যেন হাতির চারণক্ষেত্র। ব্যাঘ্র প্রকল্প হলেও হাতিই বড় বিপদ।

সে বছর আমার ডিরেক্টর সেন সাহেব ঠিক করলেন পশ্চিমবঙ্গের ভূ-তাত্বিক চরিত্রের একটা সামগ্রিক ধারনা তৈরী হওয়ার লক্ষ্যে দক্ষিণবঙ্গ এবং উত্তরবঙ্গ দুই এলাকার ভূ-তাত্বিকদের একত্রিত ফিল্ড করা হবে। উত্তরবঙ্গে আমার সহকর্মী ছিল দেহরাদুনের ছেলে ভূপেন্দ্র সিং, আদরে বা সংক্ষেপে ভূপী। দক্ষিণবঙ্গ ঘুরে সবাই এবার উত্তরবঙ্গে। আমি আর ভূপী আমাদের কাজের এলাকা দেখাব।

একটিমাত্র জিপে আমরা সবাই আরোহী। সামনে চালকের পাশের আসনে সেন সাহেব বসেছেন। আমরা বাকি সবাই জিপের পিছনের সিটে। সকলের চতুর্দিক দেখবার সুবিধার জন্য গাড়ির ক্যানভাস হুড খুলে রাখা হয়েছে। জিপের চালক তালুকদারবাবু। গাড়ির সাইলেন্সারে সামান্য আওয়াজ ছাড়া বাকি সব কিছু ঠিকঠাকই চলছে। সময় পেলে সাইলেন্সারটাও ঝালিয়ে নেব।

ভূপী আর আমি সকাল থেকেই ঘুরে ঘুরে আমাদের কাজ দেখিয়েছি। এবার আমাদের ক্যাম্পের কাছাকাছি এসেছি। এখন গন্তব্য সেই রাজাভাতখাওয়া-জয়ন্তীর পাকা রাস্তা দিয়ে জয়ন্তীর বেশ কিছু আগে ডান হাতের একটা ফায়ার লাইন ধরে জয়ন্তী নদী (দাবানলে জঙ্গলের ক্ষতি কমাতে লম্বা লাইন বরাবর গাছ কেটে সাফ করা হয়, আগুনের বিস্তার নিয়ন্ত্রিত করতে — সেই হচ্ছে ফায়ার লাইন)। পাকা রাস্তা ছেড়ে ফায়ার লাইন ধরেছি — ৪-৫ কিলোমিটার দূরেই জয়ন্তী নদী। জঙ্গলের মধ্যে গাছের ফাঁকফোঁকর দিয়ে জায়গায় জায়গায় রোদ এসে পড়েছে। একটা আলোছায়া ভাব।

হঠাৎ ভূপী আমাকে সতর্ক করলো — ও দূরে কালচে রঙের কিছু নড়তে দেখেছে। ফায়ার লাইনের ধারের দিকে। তালুকদারবাবুকে গাড়ি থামাতে বলা হলো। সবাই খুব ভালো করে নজর করলাম বেশ কিছু সময় নিয়ে। সবাই বললো ভূপীর দৃষ্টিভ্রম। গাড়ি আবার সামনের দিকে চলতে শুরু করলো। কিছুদূর যেতে না যেতেই এবার আমার যেন সন্দেহ হলো ডানদিকের জঙ্গল যেখানে ফায়ার লাইনের কাছে শেষ হচ্ছে সেখানে কিছু একটা নড়াচড়া করেছে। আবারও গাড়ি থামিয়ে দেওয়া হলো। আবারও সবাই মন দিয়ে নজর করলাম। কিছুই দেখতে পেলাম না। তবে, এবার নিছক দৃষ্টিভ্রম ধরে না নিয়ে স্থির করা হলো আমরা জিপের মুখ পিছনের দিকে করে ব্যাক গিয়ার দিয়ে জয়ন্তী নদীর দিকে যাব (কলকাতার বাসে কন্ডাক্টরের প্রচলিত নির্দেশ — পিছনের দিকে এগিয়ে যান — মনে করে দেখুন)। বিপদ আসলেই যাতে দ্রুত জঙ্গলের বাইরে পালাতে পারি। এই ভাবে সন্দেহজনক জায়গার দিকে অনেকটা এগিয়ে গিয়েও কোনরকম জনপ্রাণীর দেখা পাওয়া গেল না। তাই আবার গাড়ির ফ্রন্ট গিয়ার, এবং অচিরেই আমরা গন্তব্যে — জয়ন্তী নদীর পার।

একটা ছোট কুটীর মতন, সেখানে বনবিভাগের এক কর্মী থাকে। আশেপাশে কিছু চাষ-আবাদের চেষ্টা। তবে হাতির উপদ্রবে ফসল খুব সামান্যই জোটে। গোদা গোদা পায়ের ছাপ, আর স্তূপাকার বিষ্ঠা ইতস্ততঃ ছড়ানো। সেখানে বেশ খানিক ভূ-তত্বচর্চার পর ফিরতি যাত্রা। একমাত্র পথ সেই ফায়ার লাইন।

দিনের কাজ শেষে ক্যাম্পের পথে। দূর থেকে দেখলাম আমাদের পথের আড়াআড়ি একটা গাছের ডাল পড়ে রয়েছে। জঙ্গলে এক টুকরো গাছের ডাল থাকলে কীই বা অবাক হওয়ার আছে? কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, কে ফেলেছে? আমরা ফিরবার রাস্তায় কোনো লোকজনকে যেতে দেখি নি। ভাবতে ভাবতেই সামনের আসন থেকে হঠাৎ সেন সাহেবের চিৎকার — হাতি! একই সঙ্গে তালুকদারবাবুর তৎপরতায় জিপের গতি জাতীয় সড়কে গতির কাছাকাছি। উনি জিপটাকে যথাসম্ভব ডানদিকে নিয়ে গাছের ডালটা এড়িয়ে গিয়েই আবার নিজস্ব পথে গাড়িকে আনলেন। গাড়িতে একটা প্রবল ঝাঁকুনি। আমি জিপের পিছন থেকে দেখতে পেলাম বামদিকের জঙ্গল ফুঁড়ে এক হাতি শূঁড়টাকে সোজা মাথার উপর তুলে মুখে বিকট এক চিৎকার দিয়ে গাড়ির উপর আছড়ে পড়তে চাইছে। প্রথম মূহুর্তে যেন একটা ধূলোর কুন্ডলী হাতিকে ঘিরে। ওর ওজন এবং গতির কারণে নিজেকে সামলাতে না পেরে ফায়ার লাইনের বামদিক থেকে লাইন অতিক্রম করে ডানদিকে গেল। তারপর আবারও ফিরে এসে জিপের পিছনে তাড়া করতে লাগলো। অভিজ্ঞ তালুকদারবাবু ততক্ষণে নিরাপদ দূরত্বে গাড়ি নিয়ে গিয়েছেন। হাতিও একসময় দৌড় বন্ধ করলো। হাতি দৃষ্টির বাইরে যাওয়ায় তালুকদারবাবুকে জিপের গতি কমাতে বলা হলো — ঐখানে ঐ অবস্থায় জিপ বিগড়ালে আরও বিপদ।
পাকা রাস্তায় পৌছে জিপের মুখ — না ক্যাম্পের দিকে নয়, আলিপুরদুয়ারের দিকে। সাইলেন্সারটা ঝালাই করতেই হবে।

One thought on “বাঘের ঘরে হাতির বাসা

Leave a reply to Pradip Sengupta Cancel reply